Breaking News

ভাইপো’র উৎস সন্ধানে

Post Views: website counter

ভাস্করব্রত পতি 

 

রাজ্য রাজনীতিতে এখন অতি জনপ্রিয় একটি শব্দ — “ভাইপো”! একসময় পাড়ায়, বাসে, ট্রেনে অপেক্ষাকৃত ছোট অথচ স্নেহের মানুষকে ডাকা হতো “ভাইপো” সম্বোধন করে! আদুরে ডাক ছিল তা। এখন রাজনীতির জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে ঠিক ১৮০ ডিগ্রি উল্টোদিকে ঘুরে গেছে তথাকথিত ‘ভাইপো’ শব্দটির ব্যবহার। এই ডাকে কেমন যেন স্বজনপোষণের গন্ধ মিলছে! অনধিকার সুযোগ নেওয়ার একটা জনপ্রিয় চরিত্র যেন হয়ে উঠেছে এই “ভাইপো”!! ঠিক যেন কাকু, পিসিমনির বেআইনী আদরে বখে যাওয়া এক অকালকুষ্মাণ্ড আত্মীয়!

সম্প্রতি এক নেতা তাঁর ফেসবুক পেজে লিখেছেন, “বরাবরই কমবয়সী অনেককেই ‘ভাইপো’ বলে ডাকতাম। পছন্দ করতো। খুশি হোতো। আনন্দ পেতো। ইদানিং ‘ভাইপো’ বলে ডাকলেই – অখুশি। মুখ ব্যাজার। খুব খেপে যাচ্ছে। যেন অপরাধী ভাবছে নিজেকে। বড়ই অসম্মানিত বোধ করছে। ভাইপো’র মতো আন্তরিক সুসম্পর্কটা কলুষিত হয়ে গেল — মাননীয়া”!! যাইহোক, রাজনীতির পঙ্কিল পথে না গিয়ে বরং উঁকি দেওয়া যাক ‘ভাইপো’র ঠিকুজি কুষ্ঠির উদ্ধারকার্যে। যদি কিছু পাই!!

ভাইপোর অর্থ ‘ভ্রাতুষ্পুত্র’। এছাড়া ভাতৃজ, ভাতৃব্য, ভাতৃতনয়, ভাতিজা অর্থেও ‘ভাইপো’ বোঝায়। সংস্কৃত শব্দ ‘ভ্রাতৃ’ থেকে প্রাকৃত শব্দ ‘ভাই’ এসেছে। অর্থাৎ সহোদর। ‘কাশীদাসী মহাভারত’এ আছে “যুধিষ্ঠির পঞ্চ ভাই প্রণমিল পদে”! সেই ‘সহোদর’ তথা ভাইয়ের ছেলেই হোলো “ভাইপো”!

ভাই + পো > ভাইপো

তেমনি বোনের ছেলেকে বলে ‘বোনপো’। আর ভাইয়ের মেয়ে হোলো ‘ভাইঝি’। বোনের মেয়ে – ‘বোনঝি’। ‘ভাইপো’, ‘বোনপো’ শব্দের মতোই ‘পো’ যুক্ত হয়ে ‘ঠাকুরপো’ শব্দের উৎপত্তি। ‘ঠাকুর’ অর্থাৎ ‘শ্বশুরের পো’ তথা শ্বশুরের ছেলে বা এককথায় ‘দেওর’ তথা ‘দেবর’। মানিক গাঙ্গুলির ‘ধর্মমঙ্গল’এ এই ‘ঠাকুর’ অর্থে শ্বশুরকে বোঝানো হয়েছে – “কি হইল ঠাকুর”। আর ঠাকুরের জামাইই তো ‘ঠাকুরজামাই’!

“পো” বলতে পুত্র বা ছেলে বা সন্তানকেই বোঝায়। ‘কৃত্তিবাসী রামায়ণ’এ পাই “পো বর্জ্জিতে তোমার বাপ কাহি নাহি আনে”! ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’এ আছে “যশোদার পোঅ”! আসলে সংস্কৃত শব্দ ‘পোত’ থেকে প্রাকৃত ‘পোঅ’ হয়ে বাংলায় ‘পোআ’ বা ‘পোয়া’ বা ‘পো’ হয়েছে। ‘পোত’ থেকে এসেছে ‘পুত’। তা থেকে ‘পুত্র’। ওডিয়াতে বলে ‘পুয়’ বা ‘পুঅ’। মারাঠিতে ‘পোর’, তেলুগুতে ‘পৈয়’ এবং তামিলে ‘পৈয়ন’ বলে ‘পো’ বা পুত্রকে। আর হিন্দিতে ‘পোয়া’ অর্থে সর্পশিশু বোঝায়।

কবিকঙ্কন চণ্ডীতে আছে “ছিল অভাগীর …. এক পো”। এই ‘পো’ শব্দটি যেকোনও শাবক বা শিশু বা বালককেও বোঝানো হয়। পাশাপাশি অন্যান্য ছোট যেকোনও জিনিস সম্পর্কে ব্যবহৃত শব্দ এই ‘পো’ থেকেই সৃষ্ট। অর্থের সঙ্কোচন ঘটেছে এক্ষেত্রে। এখান থেকেই সৃষ্ট ‘পুয়া’ শব্দটি। যার অর্থ চারাগাছ। গ্রামাঞ্চলে আমরা আউড়ে থাকি লঙ্কাপুয়া, বেগুনপুয়া, টমেটোপুয়া ইত্যাদি। অর্থাৎ লঙ্কা, বেগুন, টমেটোর শিশু চারাগাছ।

আবারও ‘পোয়াতি’ বা ‘পুয়াতি’ এসেছে এই ‘পো’ থেকেই। অর্থাৎ যিনি পো’র জন্ম দিতে চলেছেন। এককথায় প্রসূতি মা বা পুত্রবতী নারী। সদ্যপ্রসূতা নারীও ‘পোয়াতি’। ‘বঙ্গসাহিত্য পরিচয়’তে পাই “জন্মমাত্র বলে ডাক / পো এড়িয়া পোয়াতি রাখ”! ‘অমৃতগ্রন্থাবলি’ অনুসারে “কে পোয়াতি রসবতী খোলা নিবি আয়রে”! আর হেমচন্দ্র তো লিখেছেন, “বড় ঠাকরুণ সাত পোয়াতির মা”! আমরা একের ব্যপদেশে অন্যের অভীষ্টসিদ্ধি লাভকে সামনে রেখে প্রবাদে প্রায়শই আওড়াই “পোর নামে পোয়াতি বাঁচে”। দীনবন্ধু মিত্রও লিখেছেন, “ছেলে দেখিবার যাব বাটা নিতে হয় / পোনামে পোয়াতি বাঁচে সর্ব্বলোকে কয়”।

‘ভাইপো’ শব্দের আড়ংধোলাই থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে কবি কৃষ্ণ ধরের লেখা ‘প্রশ্ন’ কবিতার দিকে একটু তাকাই বরং। এখানেও এসেছে পিসি ও ভাইপোর যুগলবন্দী। তিনি লিখেছেন, “বিন্দুবাসিনী পিসি ডেকে ক’ন জোরে / বল্ দেখি মাথা কেন ব’সে থেকে ঘোরে? / …… / কার ধান কোটে বল্ বুদ্ধির ঢেঁকি / অভিধান ঘেঁটে বল্ সাত পাঁচে কী? / …. / কতো টক খেলে মেটে শরীরের ঝাল / কোন সূতো দিয়ে বোনে চিন্তার জাল ? / বল তো চাঁদের হাট বসে কোন্ বারে / সময় গড়ায় কোন্ ঢালু পথ ধরে? / ভেবে ভেবে ভাইপোর চুল হলো খাঁড়া / পিসিমা ধমকে কন — এক পায়ে দাঁড়া”!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *