Breaking News

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা খুবই জরুরি

Post Views: website counter

 

তপন মল্লিক চৌধুরী 

সিনিয়র জার্নালিস্ট 

করোনা ভাইরাসের মতো আরেকটি ভাইরাস মহামারি হয়ে বিশ্বজুড়ে তাণ্ডব চালিয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর দিনগুলোয়। স্প্যানিশ ফ্লুতে খ্যাত বিশ্বের প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন। কয়েক হাজার মানুষ ওই স্প্যানিশ ফ্লুতে মারা যান। গবেষকদের দাবি, ওই স্প্যানিশ ফ্লুতে বিশ্বব্যাপী মারা যায় প্রায় ১৯ থেকে ৫০ মিলিয়ন মানুষ।

স্প্যানিশ ফ্লুতে মৃত্যু প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত মানুষের চেয়েও বেশি ছিল। ১৯১৮ জানুয়ারি থেকে ১৯২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ওই স্প্যানিশ ফ্লুর তাণ্ডবে ভারত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উত্তর ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া ওই ফ্লু থেকে ভারতে প্রায় ১২ থেকে ১৭ মিলিয়ন মানুষ মারা যায় বলে গবেষকরা দাবি করেছেন। আর ভারতের মধ্যে বাংলায় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। বাংলার পরিস্থিতি এত খারাপ ছিল যে সৎকার করার মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল।

করোনা ভাইরাসের মতো স্প্যানিশ ফ্লুও বন্যপ্রাণী বা পাখি থেকে মানুষে ছড়িয়েছিল। করোনা ভাইরাসের মতো ওই ফ্লুর আক্রমণের মূল জায়গা ছিল মানুষের ফুসফুস। ফলে শ্বাসকষ্টজনিত রোগেই অধিকাংশ মানুষের মৃত্যু হয়। প্রথমদিকে ভারতীয়রা স্প্যানিশ ফ্লুকে গুরুত্ব দেয়নি। কারণ, তারা মনে করেছিল ইউরোপের ঠান্ডা আবহাওয়ায় জন্ম নেওয়া ওই ফ্লু ভারতের আবহাওয়ায় খুব বেশি দিন কার্যকর থাকতে পারবে না। ফলে ভারতীয়রা স্প্যানিশ ফ্লুর ক্ষতিকর প্রভাবকে ফুৎকারে উড়িয়ে দেয়।

দ্বিতীয়ত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ব্রিটিশ সরকার সাধারণ মানুষের জীবনের চেয়ে ভারতীয় অর্থনীতি থেকে বহু মুনাফা লাভের আশায় অর্থনীতির চাকা সচল রাখাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে সামাজিক বিছিন্নতা বা Social Distancing-এর নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগে ব্রিটিশ সরকারের আগ্রহ ছিল কম।

মনে রাখা দরকার, একজন করোনা ভাইরাস বহনকারীও যদি অন্য মানুষের সংস্পর্শে আসে তাহলে যত পদক্ষেপই নেওয়া হোক না কেন করোনার সংক্রমণ রোধ করা যাবে না। যার বড় উদাহরণ দক্ষিণ কোরিয়া। সেখানে একজন ব্যক্তি থেকে হাজার হাজার ব্যক্তি সংক্রমিত হয়েছে। ওই ব্যক্তি যে করোনা ভাইরাস বহন করছে তা প্রথমে জানা যায়নি। ফলে তিনি অবাধে চলাচল করেছেন। চার্চে গিয়েছেন প্রার্থনার জন্য। রেস্টুরেন্টে গিয়েছেন বন্ধুদের সঙ্গে ডিনার খেতে।

এর পর ওই চার্চে প্রার্থনায় অংশ নেওয়া কয়েক হাজার মানুষ এবং রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া মানুষরা তার মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছে। যার ফলে দক্ষিণ কোরিয়ায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। ইতালিতেও একই ঘটনা ঘটেছে। সেখানেও করোনা বহনকারী একজনের উদাসীনতার ফল এখন তারা ভোগ করছেন। তাই সরকারের প্রথম কাজ করোনা ভাইরাস বহনকারী প্রতিটি ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা। আর এই চিহ্নিত করার কাজ খুব সহজ নয়। কারণ, করোনা এক অজ্ঞাত শত্রু যে নিজেকে প্রকাশ করতে ৭ থেকে ১৪ দিন সময় নেয়।

অনেক আগেই সরকারের উচিত ছিল আন্তর্জাতিক উড়ান চলাচল বন্ধ করা এবং অন্তত দুই সপ্তাহের জন্য পুরো দেশ লকডাউন করে সব মানুষকে সামাজিক বিছিন্নতার নীতি কঠোরভাবে পালন করতে বাধ্য করা। সেতা করা হলেও অনেক দেরি হয়েছে। সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ওপরই বেশি জোর দেওয়া হলেও অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। এটা মনে রাখতে হবে, কোনও মানুষ ঘর থেকে বের হতে না পারলে নতুন কেউ সংক্রমিত হবে না।

এরমধ্যে লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ায় কারা করোনা ভাইরাস বহন করছে তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। তখন ওই সংক্রমিত ব্যক্তিদের আইসোলেশনে রেখে এবং তার সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইনে রেখে করোনো ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানো যাবে। এই মুহূর্তে এর কোনও বিকল্প নেই।

দুই সপ্তাহ দেশ লকডাউন থাকলে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু কারা ভাইরাস বহন করছেন তা চিহ্নিত করতে না পারলে সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা দিন দিন জ্যামিতিক হারে বেড়ে মহামারির রূপ নিলে দেশের অর্থনীতি দুই সপ্তাহ লকডাউনের চেয়েও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর মানুষের জীবন রক্ষার চেয়ে অর্থনীতি রক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *